পড়তে 4 মিনিট

লেখা থেকে ছবি: কয়েকটি সাধারণ বর্ণনার বাক্য থেকে কম্পিউটার কীভাবে শিল্পকর্ম আঁকে?

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

লেখা থেকে ছবি তৈরির প্রযুক্তি হলো জেনারেটিভ এআইয়ের এমন এক উদ্ভাবন যা মানুষের লিখিত ভাষার প্রম্পটকে উচ্চমানের শিল্পকর্মে রূপান্তর করে। কোটি কোটি ছবি ও তার বর্ণনামূলক ক্যাপশনের মধ্যকার সম্পর্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে কম্পিউটার শিখে নেয় কীভাবে নির্দিষ্ট শব্দকে নির্দিষ্ট রং, আলো এবং বাস্তবসম্মত অবয়বে রূপ দিতে হয়।

শব্দের জাদুকরী তুলি এবং ডিজিটাল ক্যানভাসে রঙের মেলা

যুগের পর যুগ ধরে মনের ভেতর জেগে ওঠা কোনো সুন্দর ভাবনাকে ছবিতে রূপ দিতে মানুষের দরকার হতো রং, তুলি আর বছরের পর বছরের সাধনা। আপনি যদি চাইতেন 'বর্ষার মেঘলা দিনে সুন্দরবনের খালের ভেতর ভাসমান এক জেলের নাও, যার পেছনে ঘন বাদাবন আর বৃষ্টিভেজা বাতাস', তবে একজন দক্ষ শিল্পীকে ক্যানভাসে সেই দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে দিনের পর দিন ঘাম ঝরাতে হতো। কিন্তু আজকে আপনি কম্পিউটারের পর্দায় শুধু এই একটি বাক্য লিখে 'এন্টার' চাপলেই মাত্র দশ সেকেন্ডের মধ্যে কোনো প্রথিতযশা শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক অপূর্ব ক্যানভাস আপনার সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে!

এই প্রযুক্তির নাম টেক্সট-টু-ইমেজ বা লেখা থেকে ছবি তৈরি। এই সফটওয়্যারটি ইন্টারনেট থেকে পুরোনো কোনো ছবি নকল করে জুড়ে দেয় না, বরং আপনার প্রতিটি শব্দের অন্তর্নিহিত ভাব বুঝে নিজের তুলি দিয়ে নতুন ছবি আঁকে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা শুনে স্কেচ আঁকা শিল্পী

এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য আদালতের একজন দক্ষ স্কেচ শিল্পীর কথা ভাবুন। তার সামনে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বসে আছেন যিনি দূর থেকে কোনো ঘটনা ঘটতে দেখেছিলেন। সেই প্রত্যক্ষদর্শী ছবি আঁকতে পারেন না, তিনি কেবল মুখে মুখে বর্ণনা দিচ্ছেন: 'লোকটির কপাল ছিল চওড়া, চোখে ছিল মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে ছিল খাদি কাপড়ের পাঞ্জাবি আর তার বাঁ গালে একটি স্পষ্ট কাটা দাগ ছিল।'

সেই স্কেচ শিল্পী নিজের জীবনে হাজার হাজার মানুষের মুখ, চশমার নানা ধাঁচ এবং পোশাকের ভাঁজ দেখেছেন। তিনি প্রত্যক্ষদর্শীর একটি একটি কথা শোনেন আর পেনসিল দিয়ে কাগজের বুকে টান দেন। প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, 'না না, চশমাটা চারকোনা নয়, গোল ছিল।' শিল্পী সাথে সাথে রবার দিয়ে মুছে চশমাটি গোল করে দেন। মাত্র বিশ মিনিটের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীর মনের ভেতরের স্মৃতি কাগজের পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। এখানে প্রত্যক্ষদর্শী দিয়েছিলেন কেবল শব্দের বিবরণ, আর শিল্পী নিজের অভিজ্ঞতার আলোয় তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবিতে রূপ দিলেন।

লেখা থেকে ছবি আঁকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক এই বিচক্ষণ শিল্পীর মতোই কাজ করে। সে ইন্টারনেটের শত কোটি ছবি এবং তার নিচে লেখা বিবরণ পড়ে শব্দ ও ছবির সম্পর্কটি মুখস্থ করে নিয়েছে। 'গোধূলি' বললে কেমন মায়াবী সোনালি আলো পড়ে আর 'উদ্বেগ' বললে মানুষের কপালে কেমন ভাঁজ পড়ে, তা সে খুব ভালো করেই জানে।

সৃষ্টিশীল কাজ ও পেশাগত জীবনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার

শিল্পী, শিক্ষক, লেখক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এই প্রযুক্তি এক অসাধারণ সহযাত্রী হিসেবে কাজ করছে:

  • বইয়ের প্রচ্ছদ ও গল্পের ছবি আঁকা: লেখকেরা নিজেদের উপন্যাসের দৃশ্য বা রূপকথার চরিত্র নিজের পছন্দমতো তৈরি করে বইয়ের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
  • শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনা ও শিক্ষা উপকরণ: শিক্ষকেরা বিজ্ঞানের জটিল অঙ্গসংস্থান বা ইতিহাসের যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য চোখের সামনে জীবন্ত করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন।
  • ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিজ্ঞাপনী প্রচারপত্র: নিজের ঘরে তৈরি পণ্য বা হস্তশিল্পের জন্য আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনী পোস্টার তৈরি করে সাধারণ মানুষ বাড়তি খরচ বাঁচাচ্ছেন।
  • স্থাপত্য নকশা ও ঘরের সাজসজ্জা: বাড়ি নির্মাণের আগে ঘরের আসবাবপত্র কেমন দেখাবে কিংবা দেয়ালের রং কেমন ফুটবে তা আগেভাগেই ছবিতে দেখে নেওয়া যাচ্ছে।

সুন্দর ছবি পাওয়ার কিছু সহজ কৌশল ও সতর্কতা

এই আধুনিক প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করতে কিছু সাধারণ বিষয় মাথায় রাখলে অনেক বেশি নিখুঁত শিল্পকর্ম পাওয়া যায়।

  • আলো, পরিবেশ ও কোণের বিস্তারিত বর্ণনা দিন: শুধু 'নদী' না লিখে 'সূর্যাস্তের রক্তিম আলোয় শান্ত ধলেশ্বরী নদী, কুয়াশায় ঢাকা দূরবর্তী গ্রাম' লিখলে চমৎকার ছবি তৈরি হয়।
  • ধাপে ধাপে নির্দেশনা পরিমার্জন করুন: প্রথম চেষ্টায় ছবি পুরোপুরি মনের মতো না হলে তাতে কী বদলাতে হবে তা স্পষ্ট ভাষায় নতুন করে লিখে দিন।
  • আসল চিত্রশিল্পীদের সাধনা ও স্বত্বাধিকারকে শ্রদ্ধা করুন: কম্পিউটার হয়তো দ্রুত ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের সত্য অনুভূতি ও মৌলিক প্রতিভার মূল্য অপরিসীম।

শব্দ দিয়ে রঙের রাজ্য গড়ে তোলার এই প্রযুক্তি প্রতিটি সাধারণ মানুষকে শিল্পী হওয়ার আনন্দ এনে দিয়েছে। নিজের ভেতরের কল্পনাকে ভয় না পেয়ে প্রযুক্তির সহযোগিতায় প্রকাশ করাই এই নতুন যুগের আসল সার্থকতা।

উৎস
  1. Imagen: Text-to-Image Diffusion ModelsGoogle Research