পড়তে 4 মিনিট

ডিফিউশন মডেল: ঝাপসা কুয়াশা ও বিন্দুর ভেতর থেকে কম্পিউটার কীভাবে স্পষ্ট ছবি তৈরি করে?

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

ডিফিউশন মডেল হলো জেনারেটিভ এআইয়ের এমন এক গাণিতિક পদ্ধতি যা সম্পূর্ণ এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল ডিজিটাল বিন্দু বা নয়েজ থেকে অবিশ্বাস্য বাস্তবসম্মত ছবি ফুটিয়ে তোলে। কম্পিউটার প্রথমে কোনো ছবির ওপর ধীরে ধীরে ডিজিটাল ধুলো জমিয়ে তাকে অস্পষ্ট করার নিয়ম শেখে এবং পরবর্তীতে সেই নিয়মকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে শূন্য থেকে স্পষ্ট ছবি রূপায়িত করে।

ঝাপসা অন্ধকারের বুক চিরে রূপময় ছবির জন্ম যেভাবে হয়

পুরোনো দিনের সাদাকালো টেলিভিশনে অ্যান্টেনার তার নড়ে গেলে পর্দায় কালো-সাদা অজস্র ফুটকির যে ঝিরঝিরে মেলা দেখা যেত, তা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। সেখানে কোনো মানুষ ছিল না, নদী বা গাছপালা কিছুই ছিল না, ছিল শুধুই বিশৃঙ্খল বিন্দুর অস্থির নৃত্য। এবার ভাবুন, আপনি কম্পিউটারকে একটি বাক্য লিখে বললেন: 'সুন্দরবনের নদীর মোহনায় ভোরের আলোয় ভেসে থাকা একদল হরিণ আর মাঝির নৌকা।' আর সেই অর্থহীন ঝিরঝিরে বিন্দুর ভেতর থেকে বিন্দুগুলো ধীরে ধীরে সরে গিয়ে মাত্র দশ সেকেন্ডে এক অপরূপ, জীবন্ত ছবি আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠল! এটি কোনো জাদু নয়, আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অর্জন।

এই প্রযুক্তির নাম ডিফিউশন মডেল। বর্তমানে ইন্টারনেটে শব্দ থেকে অপূর্ব ছবি তৈরি করা প্রায় সমস্ত আধুনিক সফটওয়্যার এই পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করছে।

ভোরের ঘন কুয়াশায় মূর্তি খোদাইকারী ভাস্কর

পুরো বিষয়টি সহজে অনুধাবন করতে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে মার্বেল পাথরের খণ্ডের সামনে দাঁড়ানো একজন শিল্পীর কথা কল্পনা করুন। পাহাড়ের কোলে এত ঘন সাদা কুয়াশা জমেছে যে নিজের হাতও স্পষ্ট দেখা যায় না। সেই ভাস্করের সামনে পড়ে আছে একটি ধুলোমাটি মাখা, অমসৃণ ও ভারী পাথরের স্তূপ যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই।

ভাস্কর সেই পাথরের ভেতর থেকে একটি চমৎকার মূর্তি খোদাই করতে চান। তিনি কিন্তু শুরুতেই বড় কোনো আঘাত করেন না। প্রথম ধাপে তিনি পাথরের ওপর জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় আলগা মাটির স্তরটি আলতো করে চেঁছে ফেলেন; কুয়াশার বুক চিড়ে একটি অস্পষ্ট অবয়ব উঁকি দেয়। দ্বিতীয় ধাপে তিনি ছেনি ও হাতুড়ি দিয়ে বাড়তি পাথরের কোণাগুলো ধীরে ধীরে কেটে ফেলেন। প্রতিটি নিখুঁত টোকার সাথে সাথে পাথরের ভেতর থেকে বাড়তি অংশ সরে যেতে থাকে। অবশেষে ভোরের সূর্য ওঠে, কুয়াশা কেটে যায় এবং পাথরের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা অপরূপ সুন্দর মূর্তিটি সবার সামনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কম্পিউটারের ডিফিউশন মডেল ঠিক এই ভাস্করের মতোই ধাপে ধাপে কাজ করে। সে কোনো সাদা কাগজের ওপর কলম দিয়ে আঁকা শুরু করে না। সে পুরো পর্দায় ডিজিটাল কুয়াশার মতো লক্ষ লক্ষ রঙিন বিন্দুর এক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেয়। এরপর আপনার দেওয়া বর্ণনার সাথে মিলিয়ে যে বিন্দুগুলো দরকার নেই, সেগুলোকে এক এক করে মুছে দেয়, যতক্ষণ না ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল ছবিটি পূর্ণ রূপ পায়।

বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ডিফিউশন মডেলের ব্যবহার কোথায় হচ্ছে?

এই মডেলটি এখন আর কেবল চিত্রশিল্পীদের শখের বিষয় নয়, বড় বড় শিল্প ও পেশাগত কাজে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে:

  • বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও পোস্টার ডিজাইন: যেকোনো নতুন পণ্যের মনকাড়া প্রচারপত্র বা প্যাকেটের নকশা কয়েক সেকেন্ডে তৈরি করতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করছে।
  • চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন নির্মাণ: সিনেমার পরিচালকেরা রূপকথার রাজ্য, কাল্পনিক প্রাসাদ বা মহাকাশযানের দৃশ্য চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলতে এই ছবির সাহায্য নিচ্ছেন।
  • পুরোনো ও নষ্ট হয়ে যাওয়া পারিবারিক ছবির সংস্কার: পরিবারের প্রবীণ মুরব্বিদের পুরোনো ঝাপসা বা ফেটে যাওয়া সাদাকালো ছবিকে একদম চকচকে, রঙিন ও স্পষ্ট রূপ দিতে এটি অনন্য।
  • চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক্স-রে ও স্ক্যানের মানোন্নয়ন: হাসপাতালের সিটি স্ক্যান বা এমআরআই ছবির ঝাপসা দাগগুলো দূর করে চিকিৎসকদের নিখুঁত রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করা হচ্ছে।

এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় কিছু দরকারি সতর্কতা

ডিফিউশন মডেল দিয়ে ছবি তৈরি করা অত্যন্ত সহজ হলেও নিখুঁত ফলাফল পাওয়ার জন্য কিছু বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।

  • পরিবেশ ও আলোর বিস্তারিত বিবরণ দিন: শুধু 'নৌকা' না লিখে 'মেঘলা বিকেলে শান্ত পদ্মার বুকে পালতোলা কাঠের নৌকা, দূরের দিগন্তে গোধূলির আলো' লিখলে ছবি অনেক জীবন্ত হয়।
  • হাতের আঙুল ও লেখার দিকে সতর্ক নজর রাখুন: মানুষের হাতের পাঁচ আঙুল আঁকতে কিংবা ছবিতে বাংলা হরফ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে কম্পিউটার এখনো প্রায়ই ভুল করে ফেলে।
  • বাস্তব শিল্পীদের সৃষ্টিশীল অধিকারের প্রতি সম্মান জানান: এই প্রযুক্তি কোটি কোটি ছবি দেখে শিখেছে, তাই জীবিত কোনো শিল্পীর চিত্রকর্মের হুবহু নকল না করার নৈতিক দায়িত্ব আমাদের সবার।

অর্থহীন বিশৃঙ্খলা থেকে সৌন্দর্যের জন্ম দেওয়া মানবীয় বুদ্ধিমত্তার এক অপূর্ব সাফল্য। প্রযুক্তির এই নতুন তুলিকে শুভবুদ্ধি দিয়ে ব্যবহার করলে আমাদের মনের প্রতিটি কল্পনা ক্যানভাসে বাস্তব হয়ে ধরা দিতে পারে।

উৎস
  1. Photorealistic Text-to-Image Diffusion Models with Deep Language UnderstandingGoogle Research