পড়তে 4 মিনিট

ডিপফেক: কীভাবে নকল ভিডিওতে মানুষের মুখে না বলা কথা বসিয়ে দেওয়া হয়?

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

ডিপফেক হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এমন এক প্রকার বিশ্বাসযোগ্য নকল ভিডিও বা অডিও ক্লিপ, যা কোনো বাস্তব মানুষের মুখমণ্ডল বা কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। শত শত পুরোনো ছবি ও রেকর্ডিং পর্যবেক্ষণ করে সফটওয়্যারটি শিখে নেয় কীভাবে সেই ব্যক্তি হাসেন, চোখের পলক ফেলেন এবং কথা বলেন; এরপর অন্য কারও শরীরের ওপর সেই প্রতিচ্ছবি বসিয়ে বাস্তবে না ঘটা দৃশ্য তৈরি করে।

ডিপফেক আসলে কী এবং পর্দার আড়ালে এটি কীভাবে কাজ করে?

কল্পনা করুন, একদিন দুপুরে আপনার ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপে আপনার ভাই বা সন্তানের কাছ থেকে একটি জরুরি ভিডিও বার্তা এলো। তাকে প্রচণ্ড আতঙ্কিত দেখাচ্ছে, কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলছে যে রাস্তায় একটি দুর্ঘটনায় সে বিপদে পড়েছে এবং হাসপাতালের বিল মেটানোর জন্য এখনই বিকাশ বা নগদে কিছু টাকা পাঠানো দরকার। পর্দায় তার চেনা মুখটিই দেখা যাচ্ছে, কণ্ঠস্বরটিও একেবারে তার মতো এবং ঠোঁটের নড়াচড়াও প্রতিটি শব্দের সাথে দারুণভাবে মিলে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও এমন একটি ভিডিও কোনো ঘটনা সত্যি হওয়ার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতো। কিন্তু প্রযুক্তির বর্তমান যুগে এই পুরো ভিডিওটিই কম্পিউটারে তৈরি একটি সাজানো নাটক হতে পারে।

ডিপ লার্নিং বা কম্পিউটারের গভীর পর্যবেক্ষণ এবং ফেક বা নকল—এই দুটি শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ডিপফেক। আগে এমন ভিডিও তৈরি করতে দক্ষ শিল্পীদের দিনের পর দিন ছবি আঁকতে হতো। আর এখন কম্পিউটার প্রোগ্রাম কারও হাজার হাজার ছবি ও ভিডিও দেখে তার গালের ভাঁজ, হাসার সময় চোখের কোণ কুঁচকে যাওয়া এবং কথা বলার সময়ের সূক্ষ্ম ভঙ্গি নিখুঁતভাবে আত্মস্থ করে নেয়।

পথের নাটকের মূকাভিনেতা ও প্রজেক্টর হাতে তার সঙ্গী

জটিল প্রযুক্তিগত কচকচানি ছাড়া পুরো বিষয়টি বোঝার জন্য খোলা আকাশের নিচে পথের নাটকের দুই অভিনয়শিল্পীর কথা ভাবুন। মঞ্চে একজন শিল্পী সাধারণ ধূসর পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরেকজন সহশিল্পী যার হাতে রয়েছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্পষ্ট আলোর প্রজেক্টর। মঞ্চের ভেতরের শিল্পীটি সমস্ত শারীরিক অভিনয় করছেন: তিনি হেঁটে যাচ্ছেন, মাথা নাড়ছেন, হাত নাড়িয়ে আকুল হয়ে কথা বলছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রজেক্টর হাতে থাকা সঙ্গীটি আপনার নিজের মুখের একটি উজ্জ্বল ছবি পેલા অভিনয়শিল্পীর মুখের ওপর নিখুঁতভাবে ফেলে রেখেছেন।

মঞ্চের শিল্পী যখন ডানে বা বাঁয়ে মুখ ঘোরাচ্ছেন, সামনের সঙ্গীটিও চোখের পলকে আলোর প্রজেক্টরের কোণ এমনভাবে ঘুরিয়ে নিচ্ছেন যাতে আলোটি ঠিক মুখের ওপরই আটকে থাকে। মঞ্চের মানুষটি যখন হাসার জন্য মুখ খুলছেন, প্রজেক্টরের আলোয় ভেসে থাকা আপনার প্রতিচ্ছবিও সেই হাসির সাথে সাথে প্রসারিত হচ্ছে। কয়েক গজ দূর থেকে সাধারণ দর্শক যখন তাকিয়ে দেখছেন, তাদের কাছে মনে হচ্ছে মঞ্চে আপনি নিজেই দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। এখানে মঞ্চের শিল্পী দিচ্ছেন শরীরের নড়াচড়া, আর প্রજેক্টর হাতে থাকা সঙ্গীটি জোগাচ্ছেন আপনার মুখ।

কম্পিউটারের ভেতরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক এই অক্লান্ত প্রজেক্টর অপারেটরের মতোই কাজ করে। তার শুধু দুটি জিনিস প্রয়োজন হয়: যার মুখ নকল করা হবে তার কিছু পুরোনো ছবি বা ভিডিও, এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আসল দৃশ্যটিতে অভিনয় করা অন্য একজন রক্তমাংসের মানুষ। কম্পিউটার সেই আসল মানুষের ওপর নকল মুখটি একের পর এক ফ্রেমে তুলির মতো এঁকে দেয়। ফলে তৈরি হওয়া ভিডিওটি দেখতে শতভাগ বাস্তব মনে হলেও বাস্তবে এমন ঘটনা কখনই ঘটেনি।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ডিপফেক কোথায় কোথায় দেখা যায়?

নকল ভিডিও তৈরির এই প্রযুক্তি এখন আর কোনো গবেষণা গবেষণাগারে আটকে নেই, আমাদের চারপাশের পরিচিত পরিমণ্ডলে এটি নানা রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে:

  • সিনেমার ডাবিং ও বিদেশি ভাষার রূপান্তর: বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বাংলায় রূপান্তরের সময় বিদেশি অভিনেতাদের ঠোঁটের নড়াচড়া বাংলা শব্দের সাথে স্বাভাবিকভাবে মিলিয়ে দিতে চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।
  • স্মার্টফোনের বিনোদনমূলক ক্যামেরা ফিল্টার: তরুণ-তরুণীরা বন্ধু মহলে হাস্যকৌতুকের জন্য নিজেদের মুখ কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা প্রিয় কার্টুন চরিত্রের সাথে অদলবদল করতে নানা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করছেন।
  • পারিবারিক বিপদের নামে আর্থিক প্রতারণা: প্রতারক চক্র ফেসবুক থেকে কারও সন্তানের অল্প কিছু ভিডিও বা অডিও সংগ্রহ করে বাবা-মাকে ফোন করে বিপদ দেখায় এবং দ্রুত বিকাশে টাকা হাতিয়ে নেয়।
  • ভোটের রাজনীতি ও সামাজিক বিভ্রান্তি ছড়ানো: কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতা বা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নামে মনগড়া বক্তব্য তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।

সতর্ক থাকার উপায় এবং নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কৌশল

ভিডিও নকল হতে পারে এটা জানার পর অহেতুক ভয় পাওয়ার বা সবকিছুতেই সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। এর মূল শিক্ষা হলো আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঠান্ডা মাথায় নিজের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগানো।

  • দাঁত, চোখের পলক ও কানের পাশের অংশ খেয়াল করুন: কম্পিউটার এখনো মুখের ভেতরের দাঁতের স্পষ্ট বিন্যাস, চোখের ভেজা আভা বা মাথা ঘোরানোর সময় চুলের স্বাভাবিক নড়াচড়া হুবহু মেলাতে গিয়ে হোঁচট খায়।
  • পরিবারের জন্য একটি গোপন কোড শব্দ ঠিক রাখুন: পরিবারের সদস্যদের সাথে এমন একটি মজার বা গোপন শব্দ ঠিক করে রাখুন যা কেবল আপনারাই জানেন; বিপদের নামে টাকার দাবি এলে আগে সেই গোপন শব্দটি জানতে চান।
  • লাইন কেটে দিয়ে সেভ করা নিজস্ব নম্বরে ফোন দিন: কোনো আতঙ্কজনক ভিডিও কল এলে তাৎক্ষণিক টাকা না পাঠিয়ে লাইন কেটে দিন; এরপর ফোনে আগে থেকে সেভ করা নম্বরে সরাসরি কল করে যাচাই করুন।

পর্দার পেছনের এই কারিগরি একবার বুঝে ফেললে অমূলক ভয় দূর হয়ে যায়। আধুনিক ডিজিটাল যুগে নিরাপদে থাকার জন্য মোবাইল চালানো বন্ধ করার প্রয়োজন নেই; শুধু একটু সতর্ক দৃষ্টি, ধীরস্থির বিবেচনা এবং প্রিয়জনের সাথে সরাসরি কথা বলে নিশ্চিত হওয়ার অভ্যাসই আমাদের সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে পারে।

উৎস
  1. NIST Open Media Forensics ChallengeNIST