পড়তে 4 মিনিট

কণ্ঠ নকল: কম্পিউটার কীভাবে হুবহু আপনার গলার স্বর ও কথা বলার ধরন শিখে নেয়?

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

কণ্ঠ নকল হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত এমন একটি প্রক্রিয়া যা কোনো ব্যক্তির পূর্বের রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে তার কণ্ঠস্বরের একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করে। গলার ভারী বা তীক্ষ্ণ স্বর, শব্দের মাঝে বিরতি এবং কথা বলার নিজস্ব ভঙ্গি অনুকরণ করে কম্পিউটার এমন নতুন কথা উৎপন্ন করে যা শুনে বাস্তব ব্যক্তির কথা বলেই ভ্রম হয়।

কণ্ঠের ডিজিটাল প্রতিরূপ এবং কম্পিউটার কীভাবে কথা বলতে শেখে

কোনো এক ব্যস্ত বিকেলে আপনার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেলেন আপনার কলেজপড়ুয়া মেয়ের বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পরিচিত কণ্ঠস্বর। কথা বলার সেই একই ঢং, মিষ্টি টান এবং পরিচিত সম্বোধন শুনে মুহূর্তের জন্য আপনার মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হলো না। সে বলল যে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে তার মানিব্যাগ হারিয়ে গেছে এবং এখনই বিকাশে তিন হাজার টাকা পাঠানো খুব দরকার। কান দিয়ে শোনা পরিচিত স্বরকে আমরা চিরকাল খাঁটি সত্য বলে বিশ্বাস করে এসেছি। কিন্তু আজকের দিনে প্রযুক্তির কল্যাণে কম্পিউটার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কণ্ঠ শুনে সেই ব্যক্তির মতো কথা বলতে পারে।

এই প্রযুক্তির নাম ভয়েસ ক্লোনিং বা কণ্ঠ নকল। অতীতে দক্ষ অভিনেতারা কারও গলার স্বর নকল করতে মাসের পর মাস চর্চা করতেন। আর এখন কম্পিউটারের এলগরিদম আপনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা সাধারণ একটি ভিডিও ক্লিপ থেকেই আপনার গলার সমস্ত বৈশিষ্ট্যের ডিজিটাল ছাঁচ তৈরি করে ফেলতে পারে।

পিয়ানো টিউন કરનાર ও স্বয়ংক্রিয় পিয়ানো

পুরো কারিগরি বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য একটি বাদ্যযন্ত্রের দোকানের অভিজ্ঞ কারিগর ও স্বয়ংক্রিয় পিয়ানোর কথা চিন্তা করুন। দোকানে একজন প্রবীણ টিউন কারিগর বসে আছেন আর পাশে রাখা আছে একটি পিয়ানো যার চাবিগুলো কোনো মানুষ ছাড়াই নিজে নিজে ওঠানামা করতে পারে। কারিগর আপনার বাসায় গিয়ে আপনাকে পিয়ানোতে মাত্র দুটি বা তিনটি সুর বাজাতে অনুরোধ করলেন। আপনি যখন চাবি স্পর্শ করলেন, তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলেন: আপনি আঙুলে কতটা চাপ দিলেন, সুরটি কতক্ষণ বাতাসে কাঁপল এবং এক সুর থেকে অন্য সুরে যাওয়ার মাঝে কতটা সময় থামলেন।

তিনি এই সমস্ত সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য নিজের নোটখাতায় লিখে নিলেন এবং দোকানে ফিরে এসে স্বয়ংক্রিয় পিয়ানোর কাঠামোর মধ্যে সেই নির্দেশ সাজিয়ে দিলেন। এখন সেই পিয়ানো এমনভাবে সম্পূর্ণ নতুন সুর বাজাতে শুরু করল যেন আপনি নিজেই সেখানে বসে বাজাচ্ছেন। কারিগর ধরে নিলেন আপনার বাজানোর নিজস্ব ধরন, আর স্বয়ংক্রিয় পিয়ানো নতুন গানগুলো বাজাল আপনারই আঙ্গিকে।

কম্পিউটারের ভয়েস সফটওয়্যার ঠিক এইভাবেই কাজ করে। ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাসের চাপ, কণ্ঠনালির সূক্ষ্ম কম্পন এবং ঠোঁট ও জিহ্বার নড়াচড়া থেকে যে ধ্বনি তৈরি হয়, কম্পিউটার তার একটি গাণিতિક মানচিত্র বানিয়ে নেয়। এরপর আপনি কীবোর্ডে যে বাক্যই লিখে দিন না কেন, কম্পিউটার তা আপনার চেনা গলার স্বরে, আপনার নিজস্ব টানে অনর্গল পড়ে শোনায়।

বর্তমান সময়ে কণ্ঠ নকল প্রযুক্তির ব্যবহার কোথায় হচ্ছে?

এই প্রযুক্তিটি যেমন কল্যাণকর মানবিক কাজে উপকারে আসছে, তেমনই অসৎ চক্রের হাতে পড়ে এটি মারাত্মক ক্ষতির কারণও হচ্ছে:

  • অসুস্থতায় কণ্ঠ হারানো রোগীদের কথা ফিরিয়ে দেওয়া: গলার ক্যানসার বা জটিল অস্ত্রোপচারের কারণে যারা স্বাভাবিক কণ্ঠ হারিয়েছেন, তাদের পুরোনো অডিওর সাহায্যে কৃত্রিম কণ্ঠ উপহার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
  • অডিও বই ও সংবাদ পাঠ: বিশিষ্ট লেখক বা আবৃত্তিকারদের কণ্ঠের লিখিত অনুমতি নিয়ে শত শত পৃষ্ঠার ধ্রুপদী সাহিত্য তাদের স্বর ব্যবহার করে অডিও সংস্করণে রূপান্তর করা হচ্ছে।
  • বিদেশে থাকা স্বজনদের বিপদের নামে ভুয়া ফোন: প্রবাসে বা দূরের শহরে থাকা তরুণদের কণ্ঠ নকল করে দেশে থাকা মা-বাবার কাছে দুর্ঘটনার গল্প বলে দ্রুত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকেরা।
  • ব্যাংকের কণ্ঠভিত্তিক নিরাপত্তা ভেদ করার অপচেষ্টা: কিছু আধুনিক ব্যাংক গ্রাহকের কণ্ঠস্বরকে পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের সুবিধা দেয়; সেখানে নকল কণ্ঠ তৈরি করে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়।

কণ্ঠের প্রতারণা থেকে নিরাপদে থাকার দরকারি সতর্কতা

কানে যা শুনছি তা-ই শতভাগ খাঁটি—এই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের একটু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

  • পারিবারিক বা পুরোনো কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি জানতে চান: হঠাৎ টাকার আবদার নিয়ে এমন ফোন এলে ঘাবড়ে না গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, 'গত ঈদে আমরা কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলাম?' যার উত্তর কম্পিউটারের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
  • কথার মাঝে কৃত্রিম একঘেয়েমি ও শ্বাসের শব্দ খেয়াল করুন: সফটওয়্যারের তৈরি কণ্ঠে সাধারণত মানুষের স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের শব্দ থাকে না এবং আবেগের ওঠা-নামা কিছুটা যান্ত্রিক মনে হয়।
  • ফোন রেখে দিয়ে পরিচিত আসল নম্বরে পাল্টা কল করুন: বিপদের কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে টাকা না পাঠিয়ে ফোনটি কেটে দিন এবং নিজের ফোনে থাকা সংরক্ষিত নম্বরে কল দিয়ে সত্যতা যাচাই করুন।

মানুষের কণ্ঠস্বর হলো তার ব্যক্তিত্বের এক অনন্য ঐশ্বর্য। প্রযুক্তি হয়তো সেই স্বরের নিখুঁত অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের আন্তরিকতা, পারিবারিক মমতা এবং আমাদের প্রখর সাধারণ বুদ্ধির সামনে কোনো প্রতারণাই দীর্ঘক্ষণ টিকতে পারে না।

উৎস
  1. Preventing Harms from AI-enabled Voice CloningFederal Trade Commission