পড়তে 4 মিনিট

বাক্ শনাক্তকরণ: মুখে বলা কথাকে আপনার ফোন কীভাবে তৎক্ষণাৎ লেখায় রূপান্তর করে?

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

বাক্ শনাক্তকরণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এমন একটি প্রযুক্তি যা মানব কণ্ঠের স্বাভাবিক বাক্যকে ডিজিটাল লেখায় পরিণত করে। কণ্ঠের ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্লেষণ করে এবং পারিপার্শ্বিক অপ্রয়োজনীয় আওয়াজ ছেঁকে ফেলে কম্পিউটার প্রতিটি ধ্বনিমূলকে শনাক্ত করে এবং চোখের পলকে স্ক্রিনে নিখুঁত লিখিত রূপ তুলে ধরে।

মুখের স্বাভাবিক কথা কীভাবে এক পলকে স্ক্রিনের লেখায় রূপ নেয়?

রাস্তায় জ্যামে আটকে থাকার সময় কিংবা জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকার সময় আমরা অনেকেই এখন ফোনে টাইপ না করে শুধু মাইক্রোফোনের চিহ্নটিতে চাপ দিয়ে মুখে বলি: 'আমি কিছুক্ষণ পরেই মিটিংয়ে যোগ দিচ্ছি।' এক সেকেন্ডের মধ্যে ফোনের পর্দায় সেই কথাগুলো বাংলায় কিংবা ইংরেজিতে নিখুঁতভাবে টাইপ হয়ে যায় এবং আমরা পাঠিয়ে দিই। আমরা তো খুব সহজেই কথাটি বলে ফেলি, কিন্তু একটি কম্পিউটারের জন্য মানুষের কথা বোঝা যে কতটা কঠিন তা কল্পনা করাও দুষ্কর। একেক মানুষের গলার স্বর একেক রকম, কথা বলার গতি আলাদা, আর সেই সাথে থাকে আশপাশের রিকশার হর্ন বা ফ্যানের আওয়াজ! এত গোলমালের মধ্যেও ফোন আমাদের প্রতিটি কথা কীভাবে নিখুঁতভাবে ধরে ফেলে?

এই প্রযুক্তির নাম স্পিচ রিকগনিশন বা বাক্ শনাক্তকরণ। এটি কেবল শোনে না, বরং শব্দের ধ্বনি তরঙ্গকে বিশ্লেষণ করে তাকে ব্যাকরণসম্মত লিখিত রূপ দেয়।

আদালতের দ্রুতগতির স্টেনোগ্রাফার

পুরো বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে একটি ব্যস্ত আদালতের অভিজ্ঞ স্টেনোগ্রাফারের কথা চিন্তা করুন। আদালতের এজলাসে বিচারক, উকিল আর সাক্ষীরা তীব্র গতিতে বাদানুবাদ করছেন। সাক্ষী হয়তো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্পষ্ট স্বরে কথা বলছেন, আর আইনজীবী উচ্চকণ্ঠে জেরা করছেন। চারপাশে লোকের চাপাস্বর। কিন্তু স্টেনোগ্রাফার কারও দিকে তাকাচ্ছেন না; তার কান এবং হাতের আঙুলগুলো ব্যস্ত রয়েছে লেখার ওপর।

তার কান প্রথমে বাতাসে ভেসে আসা মূল ধ্বনিগুলোকে ধরে নেয়: 'ক', 'খ', 'গ' কীভাবে উচ্চারিত হলো। এরপর তার মস্তিষ্ক ভাষার ব্যাকরণের সাথে মিলিয়ে অর্থ বোঝে। উকিল যদি বলেন 'আমি দলিল দাখিল করছি', তবে 'দাখিল' শব্দের অর্থ তিনি প্রেক্ষাপট থেকেই বুঝে নেন; তিনি ভুল করে অন্য কোনো শব্দ শোনেন না, কারণ আদালতের পরিবেশে দলিল দাখিলই করা হয়। তিনি শ্রবণশক্তি ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে এক মুহূর্তও না থেমে সঠিক বাক্যটি খাতায় লিখে চলেন।

আমাদের ফোনের বাক্ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ঠিক এই স্টেনোগ্রাফারের মতোই তৎপর। মাইক্রোফোনে আওয়াজ প্রবেশ করা মাত্রই সফটওয়্যারটি তার কম্পনগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত করে। পেছনের গোলমাল ধুয়ে-মুছে ফেলে সে মানুষের আসল ধ্বনিগুলো শনাক্ত করে। এরপর ভাষার ব্যাকরণ মডিউলের সহায়তায় বাক্যের সাথে মানানসই শব্দগুলো পর্দায় নির্ভুলভাবে টাইপ করে দেয়।

দৈনন্দিন জীবনে বাক্ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি আজ কোথায় ভূমিকা রাখছে?

মুখে বলে কাজ করিয়ে নেওয়ার এই অনন্য সুবিধা বহু ক্ষেত্রে মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে:

  • শারীরিক প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের মোবাইল ব্যবহার: যাদের হাত কাঁপে বা কীবোর্ডে টাইপ করতে সমস্যা হয়, তারা কেবল মুখে নির্দেশ দিয়েই পুরো ফোন চালাতে পারেন।
  • ভিডিওর সরাসরি সাবটাইটেল ও শ্রুতিপাঠ: কানে কম শোনা মানুষদের জন্য টিভি বা ইউটিউবের ভিডিও চলাকালীন নিচ দিয়ে সাথে সাথে লিখিত সাবটাইটেল প্রদর্শিত হয়।
  • চিকিৎসকদের ব্যস্ত সময়ে ব্যবস্থাপত্র তৈরি: ডাক্তার রোগীকে পরীক্ষা করার সময় মুখেই ওষুধের নাম বলে যান এবং কম্পিউটারে তা ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন হিসেবে জমা হয়।
  • নতুন ভাষা শিক্ষা ও সঠিক উচ্চারণ চর্চা: ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষা শেখার সময় আমাদের উচ্চারণে কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না তা এই অ্যাপ সাথে সাথে শুধরে দেয়।

কণ্ঠের গোপনীয়তা রক্ষা ও ব্যবহারের কিছু জরুরি নিয়ম

মুখে বলে টাইপ করা যেমন আরামদায়ক, তেমনই আমাদের মাইক্রোফোনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাও খুব জরুরি।

  • স্বাভাবিক ও শান্ত গলায় স্পষ্ট উচ্চারণ করুন: চেঁচিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই; স্বাভাবিক গতিতে প্রতিটি শব্দ পরিষ্কার করে বললে কম্পিউটার সবচেয়ে সঠিক টাইপ করে।
  • মোবাইলে মাইক্রোফোনের অনুমতিগুলো যাচাই করুন: যেসব অ্যাপের আওয়াজ শোনার কোনো দরকার নেই (যেমন ক্যালকুলেটর বা গেম) তাদের মাইক ব্যবহারের সুবিধা বন্ধ রাখুন।
  • ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের পুরোনো হিস্ট্রি মাঝে মাঝে মুছে দিন: গুগল বা সিরিতে আপনার অতীতের রেকর্ড হওয়া কণ্ঠের ডাটা সময়াંતরে অ্যাকাউন্ট সেটিংস থেকে মুছে ফেলা ভালো।

মুখের কথা হলো মানুষের মনের ভাব প্রকাশের সবচেয়ে আদিম ও সহজাত মাধ্যম। সেই কথা যখন যন্ত্র বুঝতে পারে, তখন প্রযুক্তি হয়ে ওঠে মানুষের পরম আত্মীয়। একটু সচেতনতার সাথে এটি ব্যবহার করলে আমাদের দৈনন্দিন কর্মজীবন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও গতিশীল হয়ে ওঠে।

উৎস
  1. Speech-to-Text overviewGoogle Cloud