পড়তে 4 মিনিট

কৃত্রিম মুখ: বাস্তবে অস্তিত্বহীন মানুষের চেহারা কম্পিউটার কীভাবে নিখুঁতভাবে তৈরি করে?

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

কৃত্রিম মুখ হলো ক্যামেরা ছাড়া কেবল সফটওয়্যারের গাণিতિક হিসাবে তৈরি এমন কিছু ছবি যা দেখতে হুবহু রক্তমাংসের মানুষের মতো। হাজার হাজার বাস্তব প্রতিকৃতির আলো-ছায়া, চুলের ঘনত্ব এবং মুখের গঠন বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরোপুরি কাল্পনিক কিন্তু দারুণ সজীব এক নতুন অবয়ব সৃষ্টি করে যা বাস্তবে কোনোদিন জীবিত ছিল না।

শূন্য থেকে মানুষের বাস্তবসম্মত প্রতিকৃতি তৈরির কম্পিউটার কারিগরি

মানুষের মুখাবয়ব হলো প্রকৃতির এক পরম বিস্ময়: গালের পাতার সূক্ষ্ম ভাঁজ, চোখের মণিতে আলোর স্ফুলিঙ্গ, চুলের বিন্যাস আর হাসির সময় পেশির সংকোচন। আগে যদি কোনো কাল্পনিক চরিত্রের ছবি আঁকার দরকার হতো, দক্ষ চিত্রশিল্পীকে ক্যানভাসের সামনে দিনের পর দিন বসে রং-তুলি চালাতে হতো। কিন্তু আজকে আপনি যদি নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইট ব্রাউজ করে রিফ্রেশ করেন, প্রতিবার চোখের পলকে সম্পূর্ণ নতুন, অপরূপ ও দারুণ সজীব এক মানুষের ছবি সামনে ভেসে উঠবে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই চেহারার কোনো মানুষ পৃথিবীর বুকে কখনোই জন্ম নেয়নি!

ক্যামেরার লেন্স ছাড়াই কেবল গাণিতિક সমীকরণের শক্তিতে এই ছবিগুলো জন্ম নেয়। কম্পিউটার পুরোনো ছবির টুকরো কেটে এনে জোড়াতালি দেয় না, বরং একজন মানুষের মুখ কেমন হতে পারে তার সমস্ত স্বাভাবিক নিয়ম আত্মস্থ করে নিজে থেকেই একটি নতুন অবয়ব আঁকে।

আর্ট স্কুলের নতুন শিক্ষার্থী ও কড়া ড্রয়িং শিক্ষক

এই প্রক্রিয়াটি সহজভাবে বুঝতে একটি আর্ট স্কুলের ক্লাসরুমের কথা ভাবুন, যেখানে দুজন মানুষ রয়েছে: একজন নতুন শিক্ষার্থী যে ছবি আঁকা শিখছে এবং অন্যজন তার অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও কড়া ড্রয়িং শিক্ষক। শিক্ষার্থীর ইচ্ছা সে এমন একটি মানুষের ছবি আঁকবে যা দেখে সবাই আসল মানুষ ভাববে, কিন্তু সে এখনো আনাড়ি। প্রথম দিনে সে ড্রয়িং খাতায় এলোমেলো, বিকৃত ও ঝাপসা কিছু দাগ টেনে শিক্ষকের টেবিলে জমা দেয়।

শিক্ষক এক সেকেন্ড তাকিয়েই সেই ছবি বাতিল করে বলেন, 'এটা কী এঁকেছ? মানুষের কান কখনো এমন বাঁকা হয় না আর দুই চোখের মাঝে এত ফাঁক থাকে না; এটা একদমই ভুয়া, আবার আঁকো।' শিক্ষার্থী ভুল শুধরে আরেকটি ছবি আঁকে। শিক্ষক আবার তার সূক্ষ্ম ভুল ধরে বাতিল করেন। এই প্রতিযোগিতা লক্ষ লক্ষ বার চলতে থাকে। প্রতিবার শিক্ষার্থী আরও দক্ষ হয়ে ওঠে আর শিক্ষক আরও কঠোরভাবে খুত ধরেন। অবশেষে একদিন এমন আসে যখন শিক্ষার্থীর আঁকা প্রতিকৃতিটি এত সুন্দর ও নিখুঁত হয় যে কড়া শিক্ষকও আর সেটিকে কোনো ভুল বলে ধরতে পারেন না।

কম্পিউটারের ভেতরে ঠিক এভাবেই দুটি বিপরীত প্রোগ্রাম অবিরাম একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করে। একটি প্রোগ্রাম অবয়ব তৈরি করার চেষ্টা করে, আর অপর প্রোগ্রামটি লাখ লাখ বাস্তব ছবির সাথে মিলিয়ে দেখে তাতে খুঁত আছে কি না। এই নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত যে চেহারাটি পর্দায় ফুটে ওঠে, তা কোনো বাস্তব মানুষের না হলেও দেখতে শতভাগ জীবন্ত মনে হয়।

বাস্তব জগতে এই কৃত্রিম মুখগুলো কোথায় কোথায় কাজে লাগছে?

বিনোদন ও বাণিজ্যিক জগৎ ছাড়িয়ে এই কৃত্রিম প্রতিকৃতিগুলো এখন নানামুখী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে:

  • বিজ্ঞাপন ও পণ্যের প্রচারপত্র: কাপড়ের বা প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে কোটি টাকা খরচ করে পেশাদার মডেল ভাড়া করার বদলে অনেক প্রতিষ্ঠান কম্পিউটারে তৈরি নান্দনিক মুখচ্ছবি ব্যবহার করছে।
  • ভিডিও গেম ও ডিজিটাল বিনোদন: বড় বড় কম্পিউটার গেমে পুরো শহরের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো শত শত বৈচিত্র্যময় নাগরিক চরিত্র তৈরিতে এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে।
  • অনলাইনে পরিচয় গোপন রাখার সুবিধা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পারিবারিক বা আসল ছবি প্রকাশ না করে ডিজিটাল নিরাপত্তা বজায় রাখতে অনেকে এই কাল্পনিক মুখ ব্যবহার করছেন।
  • ভুয়া প্রোফাইল ও বিভ্রান্তি ছড়ানো: সাইবার দুর্বৃত্তরা মানুষের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে প্রতারণা করার জন্য এই অস্তিত্বহীন মুখগুলো দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা বিশ্বাসযোগ্য প্রোফাইল গড়ে তুলছে।

কৃত্রিম ছবি শনাক্ত করার কিছু কার্যকর কৌশল ও পর্যবেক্ষণ

প্রথম দেখায় এই ছবিগুলো নিখুঁত মনে হলেও মানুষের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কিছু সূক্ষ্ম বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে কম্পিউটার এখনো কিছু ভুল করে ফেলে।

  • গয়না, চশমা এবং কানের গড়ন গভীরভাবে দেখুন: কম্পিউটার প্রায়শই এক কানে এক রকম দুল এবং অন্য কানে অন্য রকম দুল এঁকে ফেলে, অথবা চশমার দুই ডাঁটি দুই রকম বানিয়ে ফেলে।
  • পেছনের পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ড পরখ করুন: আসল ছবিতে পেছনের গাছপালা, দেয়াল বা রাস্তা স্পষ্ট দেখা যায়; কৃত্রিম ছবিতে পেছনের অংশটি কেমন যেন গলে যাওয়া বা অস্পষ্ট দেখায়।
  • চুল ও পোশাকের সীমানা লক্ষ্য করুন: মানুষের চুল যেখানে ঘাড় বা কাপড়ের কলার স্পর্শ করে, সেখানে কম্পিউটারের রঙ অনেক সময় কাপড়ের ভেতর মিশে একাকার হয়ে যায়।

ইন্টারনেটের পর্দায় দেখা প্রতিটি সুন্দর মুখই বাস্তব মানুষের হবে এমন ভাবার সুযোগ এখন আর নেই। একটু সজাগ চোখ ও সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা সহজেই ভার্চুয়াল ছবির আসল রূপটি চিনে নিতে পারি।

উৎস
  1. A Style-Based Generator Architecture for Generative Adversarial NetworksNVIDIA Research