পড়তে 4 মিনিট
মুখ শনাক্তকরণ: একটি ক্যামেরা চোখের পলকে কীভাবে আপনাকে নির্ভুলভাবে চিনে নেয়?
30 সেকেন্ডে সারাংশ
মুখ শনাক্তকরণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর এমন এক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা মানব মুখের শারীরিক গঠনের গাণিতિક পরিমাপের সাহায্যে মানুষের পরিচয় নিশ্চিত করে। দুই চোখের মণির ব্যবধান, নাকের দৈর্ঘ্য এবং গালের হাড়ের ঢাল মেপে সফটওয়্যারটি কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যে ডাটাবেসের তথ্যের সাথে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করে।
ক্যামেরা কীভাবে মানুষের মুখকে গাণিতિક সংখ্যায় পরিণত করে?
ঘুম থেকে উঠে সকালে আপনি আপনার স্মার্টফোনের দিকে কেবল স্বাভাবিক এক পলক তাকাতেই স্ক্রিনের তালা চোখের নিমিষে খুলে গেল। বর্তমান সময়ে বড় কোনো আধুনিক বিমানবন্দর, ট্রেন স্টেশন বা করপোরেট অফিসের প্রবেশদ্বারে এসে দাঁড়াতেই ওপরের ক্যামেরার নীল আলো জ্বলে ওঠে এবং স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজাটি খুলে আপনাকে সম্মানজনক পথ করে দেয়। চারপাশের ব্যস্ততায় শত শত অচেনা পথচারী যাতায়াত করা সত্ত্বেও সেই ছোট্ট ক্যামেরাটি এত মানুষের ভিড়ের ভেতর থেকে ঠিক আপনাকে কীভাবে আলাদা করে নির্ভুলভাবে চিনে নিল? কল্পবিজ্ঞানের সিনেমার মতো কম্পিউটার কিন্তু কোনো মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে ভাবে না; সে পর্দার আড়ালে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কিছু সুনির্দিষ্ট দূরত্বের গাণিতিক মাপজোখ করে।
এই প্রযুক্তির নাম ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখ শনাক্তকরণ। আমাদের চোখে যে সুন্দর পরিচিত চেহারাটি ভাসে, কম্পিউটার এক মুহূর্তের মধ্যে তাকে কিছু গাণিতિક অঙ্কের সাংকেতিক নম্বরে রূপান্তর করে ফেলে।
স্কেল ও কম্পাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞ ভাস্কর
পুরো কারিগরি রহস্যটি বোঝার জন্য একটি রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা অভিজ্ঞ ভাস্করের কথা চিন্তা করুন। প্রাসাদের রাজা তাকে নির্দেশ দিয়েছেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু গণ্যমান্য মেহমানকেই ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। ভাস্করের কাছে কোনো ক্যামেরা নেই, কিন্তু তার হাতে রয়েছে একটি পিতলের স্কেল ও সূক্ষ্ম কাঁটা-কম্পাস। মেহমান যখন ফটকে এসে দাঁড়ান, ভাস্কর তার গায়ের রঙ বা পোশাকের চাকচিক্য দেখেন না।
তিনি স্কেল দিয়ে মেপে নেন: বাঁ চোখের মণি থেকে ডান চোখের মণির দূরত্ব কতটুকু? নাকের ডগা থেকে ঠোঁটের ওপরের অংশের ফাঁক কতটা? এবং থুতনির হাড়ের বাঁক কত ডিগ্রির কোণ তৈরি করেছে? এই চার-পাঁচটি প্রধান মাপ তিনি নিজের খাতায় একটি সাংকেতিক সূত্রের মতো টুকে নেন। প্রতিটি মানুষের মুখের হাড়ের এই পরিমাপগুলো তার আঙুলের ছাপের মতোই অনন্য। মেহমান পাগড়ি পরে আসুন কিংবা একগাল দাড়ি নিয়ে আসুন, ভেতরের এই হাড়ের পরিমাপ কিন্তু কখনো বদলায় না।
ডিজিটাল ফেস রিকগনিশন সিস্টেম ঠিক এই মাপজোখের কাজটি বিদ্যুৎ গতিতে সম্পন্ন করে। ক্যামেরার ফ্রেমে কোনো মুখ আসা মাত্রই সফটওয়্যার মুখের ওপরের ৬৮ থেকে ১০০টি প্রধান বিন্দু শনাক্ত করে। চোখের ব্যবধান, কপালের চওড়া মাপ ও নাকের উচ্চতা হিসাব করে তৈরি হয় একটি ডিজিটাল ফেসপ্রিন্ট, যা আগে সংরক্ষিত থাকা তথ্যের সাথে মিলে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবেশাধিকার মেলে।
বাস্তব জগতে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কোথায় কোথায় কাজ করছে?
আমাদের অগোচরেই এই নজরদারি প্রযুক্তি নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে:
- স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের নিরাপত্তা: পাসওয়ার্ড টাইপ করার ঝামেলা ছাড়া কেবল এক নজর তাকিয়ে ফোনের পর্দা খোলার জন্য ফ্রন্ট ক্যামেরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
- বিমানবন্দরে দ্রুত ই-গেট ও নিরাপত্তা তল্লাশি: লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট ও বোর্ডিং পাস দেখানোর বদলে শুধু মুখের স্ক্যান দিয়েই যাত্রীরা দ্রুত প্লেনে উঠতে পারছেন।
- অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা: খাতায় সই করা বা মেশিনে আঙুলের ছাপ দেওয়ার বদলে দরজায় পা রাখতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মীদের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়ে যায়।
- অপরাধ দমন ও নিখোঁজ ব্যক্তি সন্ধান: বড় কোনো জনসমাবেশ বা রেল স্টেশনে হারিয়ে যাওয়া শিশু কিংবা সন্দেহভাজন অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করতে পুলিশ এই ব্যবস্থার সাহায্য নেয়।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা
এই প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত ও আরামদায়ক হলেও আমাদের চেহারা কিন্তু পাসওয়ার্ডের মতো যখন তখন পাল্টে ফেলা যায় না, তাই সাবধানতা বজায় রাখা জরুরি।
- ফোনে ফেস আনলকের অনুমতিগুলো যাচাই করুন: মোবাইলের সেটিংসে গিয়ে কোন কোন অ্যাপ ক্যামেরার তথ্য পড়ার সুযোগ পাচ্ছে তা দেখে অপ্রয়োজনীয় সুবিধা বন্ধ রাখুন।
- বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় মুখের স্ক্যান এড়িয়ে চলুন: শপিং মল বা দোকানে যদি বিনা প্রয়োজনে মুখের ছবি বা স্ক্যান চাওয়া হয় তবে তা না দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করুন।
- সামাজিক মাধ্যমে অতি স্পষ্ট ক্লোজ-আপ ছবি পোস্ট করার আগে ভাবুন: খুব কাছ থেকে তোলা হাই-রেজোলিউশন ছবি অনেক সময় অন্য কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে মুখের ডাটাবেস তৈরিতে ব্যবহার করতে পারে।
আমাদের মুখাবয়ব হলো আমাদের স্বকীয় পরিচয়ের সবচেয়ে বড় স্মারক। প্রযুক্তিকে সুবিধার জন্য গ্রহণ করার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখাই একজন বুদ্ধিমান নাগরিকের আসল পরিচয়।