পড়তে 4 মিনিট
আচরণগত বায়োমেট্রিক্স: ফোনের পর্দায় আঙুল ছোঁয়ানোর নিজস্ব ধরন দেখে মানুষ চেনার উপায়
30 সেকেন্ডে সারাংশ
আচরণগত বায়োমেট্রিক্স হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এমন এক সুরক্ষা প্রযুক্তি যা মানুষের বাহ্যিক শারীরিক অঙ্গের বদলে তার দৈনন্দিন ব্যবহারের সূক্ষ্ম স্বভাবগত ধরন দেখে পরিচয় শনাক্ত করে। টাচস্ক্রিনে আঙুল চালানোর ভঙ্গিমা, হাঁটার সময় ফোনের দোলন এবং কীবোর্ডে আঙুলের ছন্দের মাধ্যমে পুরো সেশন জুড়েই স্বয়ংক্রিয় যাচাই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
মোবাইলের কাচের নিচে লুকিয়ে থাকা আমাদের অবচেতন অভ্যাস
বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আঙুলের ছাপ কিংবা চোখের মণির ছবি। এগুলো সবই শরীরের স্থির অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাপ। কিন্তু ধরুন, আপনি আপনার ফোনে ব্যাংকিং অ্যাপ খুলে একটি জরুরি কাজ করছেন। হঠাৎ কোনো ছিনতাইকারী আপনার হাত থেকে ছোঁ মেরে আনলক করা ফোনটি নিয়ে দৌড়ে পালাল। ফোন তো খোলা অবস্থাতেই আছে, তাহলে কি সেই চোর আপনার ব্যাংক থেকে সব টাকা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে পারবে? বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এর উত্তর হলো 'না', কারণ ফোন সাথে সাথে বুঝে ফেলে যে কাচের ওপর যে আঙুলগুলো এখন নড়াচড়া করছে তা তার আসল মালিকের নয়!
এই বিস্ময়কর ব্যবস্থার নাম বিহেভিওরাল বায়োমেট্রিক্স বা আচরণগত বায়োমেট্রिक्स। আপনি ফোন ব্যবহারের সময় যে সমস্ত অবচেতন অভ্যাস গড়ে তুলেছেন, তা বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি আপনাকে চিনে রাখে।
টেলিগ্রাফ অফিসের অপারেটর ও মোর্স কোডে আঙুলের ছন্দ
এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য একশ বছর আগের পুরোনো টেলিগ্রাফ অফিসের কথা ভাবুন। সেই যুগে তারের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর জন্য কর্মীরা পিতলের সুইচে আঙুল দিয়ে টোকা মেরে 'টিক-টিক' শব্দে মোর্স কোড পাঠাতেন। সেই সময়ে তারের ভেতর কোনো ডিজিটাল পাসওয়ার্ড ছিল না। তবুও শত মাইল দূরে বসে থাকা আরেকজন অপারেটর কেবল কান পেতে শুনেই নিশ্চিত করে বলে দিতে পারতেন যে ওপাশ থেকে আসলে কোন মানুষটি বার্তা পাঠাচ্ছেন।
প্রতিটি টেলিগ্রাফ অপারেটরের সুইচ চাপার একটি অদ্ভুত নিজস্ব ছন্দ থাকত, যাকে তারা বলতেন হাতের মুঠি বা 'ফিস্ট'। কোনো কর্মী হয়তো বড় অক্ষরের সময় আঙুলটা একটু বেশি সময় চেপে ধরে রাখতেন, কেউ আবার দুটি শব্দের মাঝে এক বিশেষ ছন্দে বিরতি দিতেন। বর্ণমালা একই ছিল, কিন্তু সবার আঙুলের নাচন ছিল একদম আলাদা। কোনো শত্রু যদি আসল অপারেটরকে সরিয়ে নিজে সুইচে হাত দিত, অপর প্রান্তের কর্মী সাথে সাথে সতর্ক হয়ে যেতেন: 'ইনি তো আমাদের সহকর্মী নন, অচেনা কেউ চাবি টিপছে!'
আজকের স্মার্টফোন ঠিক এই পুরোনো টেলিগ্রাফারের মতোই চোখ-কান খোলা রাখে। আপনি যখন স্ক্রিনে বাংলায় কোনো বার্তা লেখেন, তখন 'ক' অক্ষরের পর 'ম' লিখতে কত মিলি সেকেন্ড সময় নিচ্ছেন, ফোনটি হাতের তালুতে কত ডিগ্রি কাত করে ধরে রেখেছেন এবং বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রল করার সময় কাচের ওপর কতটা চাপ দিচ্ছেন, সেন্সর তা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে। এই নিজস্ব ছন্দটি কেবলই আপনার।
বাস্তব জগতে আচরণগত বায়োমেট্রিক্স কোথায় নিরাপত্তা দিচ্ছে?
কোনো বাড়তি পিন কোড না চেয়েই এই প্রযুক্তি নেপথ্যে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে চলেছে:
- মোবাইল ব্যাংকিংয়ে চুরিরোধ: কোনো প্রতারক যদি আপনার পিন কোড জেনেও ফেলে, তবুও তার আঙুলের চাপ ও টাইপিংয়ের গতি আপনার সাথে না মেলায় ব্যাংক তাৎক্ষণিক লেনদেন আটকে দেয়।
- কর্পোরেট ল্যাপটপ ও দাপ্তরিক তথ্যের সুরক্ষা: কর্মকর্তা টেবিল ছেড়ে কোথাও গেলে অন্য কেউ কীবোর্ডে হাত দেওয়া মাত্রই সিস্টেম নিজ থেকেই লক হয়ে যায়।
- অনলাইন কেনাকাটায় কার্ডের নিরাপত্তা: কেনাকাটার সময় ফর্ম পূরণের গতি ও মাউস নাড়ানোর স্বাভাবিক বাঁক দেখে আসল মানুষ নাকি কোনো স্বয়ংক্রিয় রোবট তা বোঝা যায়।
- সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ছিনতাই প্রতিরোধ: অচেনা কোনো স্থান থেকে অস্বাভাবিক গতিতে অ্যাপ চালানোর চেষ্টা হলে অ্যাকাউন্ট সাময়িক স্থগিত করে সতর্কতা বার্তা পাঠানো হয়।
নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষা
এই প্রযুক্তি আমাদের বাড়তি সুরক্ষা দেয় ঠিকই, তবে আমাদের প্রতি মুহূর্তের শারীরিক স্বভাবের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে—এই সত্যটিও ভুলে গেলে চলবে না।
- অভ্যাস বদলালে সাময়িক বাধা আসতে পারে: আঙুলে চোট পেলে কিংবা তাড়াহুড়ো করে হাঁটার সময় টাইপ করলে ব্যাংকিং অ্যাপ বাড়তি ওটিপি চেয়ে বসতে পারে।
- ব্যাংকিং অ্যাপের বাড়তি অনুমতিগুলো লক্ষ্য করুন: সেন্সর ব্যবহারের সুযোগ শুধু সুরক্ষার স্বার্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা মাঝেমধ্যে খেয়াল রাখা ভালো।
- সুবিধা ও ব্যক্তিগত নজরদারির সীমা বুঝুন: এই ব্যবস্থা পাসওয়ার্ডের ঝামেলা কমায় সত্য, তবে আমাদের শারীরিক স্বভাবের ডাটা সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে তা মনে রাখা দরকার।
পর্দার ওপর আমাদের আঙুলের চলন ও ফোন ধরার ঢং হলো আমাদের এক অনন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর। এই অদৃশ্য প্রহরীর উপস্থিতির কারণে সাইবার অপরাধীদের ফাঁকি দেওয়া এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ফলে আমরা অনেক বেশি নিশ্চিন্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছি।
উৎস
- BiometricsNIST Computer Security Resource Center