পড়তে 4 মিনিট

নিউরাল যান্ত্রিক অনুবাদ: শব্দে শব্দে মেলানোর বদলে সম্পূর্ণ বাক্যের ভাব বুঝে অনুবাদ করার কৌশল

প্রকাশিত

30 সেকেন্ডে সারাংশ

নিউরাল যান্ত্রিক অনুবাদ হলো কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক চালিত এমন এক স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ পদ্ধতি যা বাক্যের ভেতরের প্রতিটি শব্দের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামগ্রিক ভাব বিশ্লেষণ করে অন্য ভাষায় রূপান্তর করে। পুরোনো নিয়মের মতো শব্দে শব্দে আক্ষরিক অনুবাদের বদলে এটি ভাষার সাংস্কৃতিক গভীরতা ও ব্যাকরণিক প্রবাহ বজায় রেখে সাবলীল অনুবাদ উপহার দেয়।

অভিধানের আক্ষরিক রদবদলের সীমানা পেরিয়ে নতুন দিগন্ত

আজ থেকে দশ-পনেরো বছর আগে কম্পিউটারে কোনো ইংরেজি বাক্যের বাংলা অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন কখনো? সেই পুরোনো দিনের অনুবাদ পড়লে পেট ফেটে হাসি আসত! ইংরেজিতে যদি লেখা থাকত 'Time flies', কম্পিউটার তার বাংলা অনুবাদ করে দিত 'সময়ের মাছিরা'! কারণ কম্পিউটারের ডিকশনারি অনুযায়ী টাইম মানে সময় আর ফ্লাইস মানে মাছি! ভাষা তো আর কোনো প্লাস্টিকের পুতির মালা নয় যে একটা পুতি সরিয়ে আরেকটা পুতি বসিয়ে দিলেই হয়ে গেল। ভাষার ভেতরে মিশে থাকে হাজার বছরের সংস্কৃতি, মানুষের বুকের ভালোবাসা, প্রবাদ-প্রবচন আর পরিস্থিতি অনুযায়ী শব্দের রূপান্তরের বিস্ময়কর ক্ষমতা।

আজকের দিনে আপনি যখন গুগল ট্রান্সলেট বা চ্যাটবটে একটি বড় অনুচ্ছেদ দেন, তখন এমন চমৎকার, মিষ্টি ও সাহিত্যিক বাংলা অনুবাদ বেরিয়ে আসে যে মনে হয় কোনো বড় লেখক নিজে বসে অনুবাদ করেছেন। এই বিপুল পরিবর্তনের পেছনের জাদুকরী শক্তির নাম নিউরাল মেশিন ট্রান্সলেশন।

দুই ভাষা ও সংস্কৃতির ভাবমর্ম জানা অভিজ্ঞ দোভাষী

পুরো বিষয়টি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে দুটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসা একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান দোভাষীর কথা ভাবুন। আমাদের দেশের নেতা বাংলায় হাসিমুখে বললেন, 'অকাল বন্যায় এবার আমাদের কৃষকের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে।' এখন সেই দোভাষী যদি আক্ষরিক অনুবাদের মতো 'মুখ' আর 'গ্রাস' শব্দ ধরে ধরে ইংরেজিতে বলতে যান, তবে বিদেশি মেহমান বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকবেন।

কিন্তু অভিজ্ঞ দোভাষী তা করেন না। তিনি পুরো বাক্যটি গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তার হৃদয়ে সেই বাক্যের পেছনের বেদনার আসল রূপটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে: 'কৃষকের বিশাল ক্ষতি হয়েছে।' তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলেন, 'The sudden floods have destroyed the ready crops, devastating the livelihoods of our farmers.' বিদেশি মেহমান এক সেকেন্ডের মধ্যে পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। দোভাষী এখানে শব্দ অনুবাদ করেননি, অনুবাদের মাধ্যমে তিনি একটি দেশের দীর্ঘশ্বাসকে অপর ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন।

কম্পিউটারের নিউরাল অনুবাদ ব্যবস্থা ঠিক এই বিচক্ষণ দোভাষীর মতোই কাজ করে। সে বাক্যের শব্দগুলোকে আলাদা করে দেখে না, বরং পুরো বাক্যটিকে একটি সামগ্রিক ভাব হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর যে ভাষায় রূপান্তর করতে হবে, সেই ভাষার স্বাভাবিক অলংকার ও মিষ্টি ছন্দে সেটিকে প্রকাশ করে।

নিউরাল অনুবাদের কারণে আজ সমাজে যোগাযোগের কী কী দুয়ার খুলছে?

ভাষার দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে:

  • বিদেশ ভ্রমণ ও সরাসরি ভাববিনিময়: বাংলাদেশের মানুষ চীন, জাপান বা ফ্রান্সে গিয়েও মোবাইলের মাধ্যমে সেখানকার স্থানীয় মানুষের সাথে দ্বিধাহীনভাবে কথা বলতে পারছেন।
  • আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও গবেষণায় প্রবেশাধিকার: বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা গবেষণাগুলো নিজ ভাষায় পড়ে জ্ঞান অর্জন করছেন।
  • প্রবাসী ভাইবোনদের বিদেশি দাপ্তরিক কাজ: মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে থাকা প্রবাসী শ্রমিকেরা ভিনদেশি ভাষায় আসা অফিশিয়াল কাগজপত্র নিজ ভাষায় অনুবাদ করে সহজেই বুঝতে পারছেন।
  • আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও হস্তশিল্পের প্রসার: টাঙ্গাইলের তাঁতি কিংবা জামদানির কারিগরেরা বিদেশি ক্রেতাদের সাথে ইন্টারনেটে নিজ ভাষায় চ্যাট করে পণ্য রপ্তানি করছেন।

নির্ভুল অনুবাদ পাওয়ার কিছু দরকারি ও ব্যবহারিক পরামর্শ

এই আধুনিক নিউরাল প্রযুক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সাবলীল হওয়া সত্ত্বেও, মানব ভাষার গভীর আবেগ ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের কথা মাথায় রেখে কিছু মৌলিক সতর্কতা মেনে চলা সবসময়ই বুদ্ধিমানের কাজ।

  • মূল বাক্যটি সহজ ও পরিষ্কারভাবে লিখুন: খুব বেশি জটিল, প্যাঁচানো বা অসম্পূর্ণ বাক্য লিখলে কম্পিউটার সঠিক অর্থ ধরতে গিয়ে ভুল করতে পারে।
  • গুরুত্বপূর্ণ লেখার ক্ষেত্রে উল্টো অনুবাদ করে দেখুন: জরুরি কোনো চিঠি ইংরেজিতে করার পর তা আবার বাংলায় রূপান্তর করে দেখুন যে মূল অর্থ অপরিবর্তিত আছে কি না।
  • আইনি ও জটিল চিকিৎসার নথির জন্য পেশাদার অনুবাদকের শরণাপন্ন হোন: আদালতের রায় বা ডাক্তারের নথির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের ওপর পুরো নির্ভর না করে দক্ষ মানুষের সাহায্য নিন।

ভাষা হলো মানুষের আত্মিক পরিচয়ের সেতু। নিউরাল অনুবাদ ব্যবস্থা পৃথিবীর তাবৎ ভাষার মানুষকে একে অপরের পরম কাছে নিয়ে এসেছে, যার ফলে সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বজোড়া মানুষের ভালোবাসার বন্ধন আজ অনেক বেশি সুদৃঢ় ও অটুট হতে পারছে।

উৎস
  1. Google's Neural Machine Translation SystemGoogle Research