পড়তে 4 মিনিট
অনুভূতি বিশ্লেষণ: মানুষের লিখিত বার্তার ভেতরের ভালোলাগা, ক্ষোভ বা আনন্দ কম্পিউটার কীভাবে বোঝে?
30 সেকেন্ডে সারাংশ
অনুভূতি বিশ্লেষণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি প্রয়োগ যা লিখিত তথ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানবিক আবেগ, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে। হাজার হাজার চিঠি বা মতামতের মধ্য থেকে কোন মানুষটি দারুণ খুশি আর কোন গ্রাহক প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ তা আলাদা করে এই প্রযুক্তি বিভিন্ন সংস্থাকে জনমতের আসল চিত্র উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানবিক আবেগ কীভাবে সংখ্যায় মাপা যায়?
একটি বড় ব্যাংক বা অনলাইন শপিং প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিদিন লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহক নানা বার্তা পাঠান। কেউ হয়তো লিখেছেন: 'আপনাদের সার্ভিস দারুণ লেগেছে, অনেক ধন্যবাদ!' কেউ আবার রেগে গিয়ে লিখেছেন: 'আমার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে অথচ পণ্য পাইনি, আমি কিন্তু ভোক্তা অধিকারে নালিশ করব!' আবার কেউ জানতে চেয়েছেন: 'আপনাদের শাখা কি শুক্রবারে খোলা থাকে?' প্রতিষ্ঠানে বসে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার পক্ষে এই লাখ লাখ বার্তা এক এক করে পড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। তবুও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের টেবিলে বিকেল হতেই পরিষ্কার হিসাব চলে আসে যে আজকের দিনে শহরের কত শতাংশ গ্রাহক সেবার ওপর খেপে আছেন আর কত শতাংশ সন্তুষ্ট! এই অসম্ভব কীভাবে সম্ভব হলো?
এই প্রযুক্তির নাম সেন্টিমেন্ট অ্যানালিসিস বা অনুভূতি বিশ্লেষণ। এর মাধ্যমে কম্পিউটার মানুষের মনের ভালোলাগা বা ক্ষোভকে গাণিতિક সংখ্যার পাল্লায় মেপে বের করে ফেলে।
ডাকঘরে চিঠির আবেগ আলাদা করা সহকারী
পুরো বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য একটি বড় সরকারি ডাকঘরের এক অভিজ্ঞ বাছাইকরণ সহকারীর কথা কল্পনা করুন। প্রতিদিন ভোরে তার টেবিলে নাগরিকদের লেখা পঞ্চাশ হাজার অভিযোগ ও কৃতজ্ঞতাপত্র এসে জমা হয়। সেই সহকারীর পক্ষে প্রতিটি চিঠি আদ্যোপান্ত পড়ার সময় নেই। তার হাতে রয়েছে তিনটি আলাদা কালির কলম: সবুজ, লাল আর কালো।
তিনি প্রতিটি চিঠির ওপর চটজলদি এক নজর চোখ বুলিয়ে নেন। চিঠির গায়ে যদি 'ধন্যবাদ', 'অপূর্ব', 'আনন্দিত' জাতীয় প্রশংসাসূচক শব্দ থাকে, তিনি খামের ওপর সবুজ রঙের সিল মারেন। আর চিঠির ভেতর যদি 'চোর', 'হয়রানি', 'দুর্নীতি', 'ক্ষতিগ্রস্ত' এই ধরনের ক্ষোভের তীব্র শব্দ দেখতে পান, তিনি সাথে সাথে বড় করে লাল কালির সিল ঠুকে দেন। সাধারণ তথ্য জানার চিঠিতে তিনি কালো সিল মারেন। মাত্র দশ মিনিটে সমস্ত চিঠি তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়: লাল রঙের সিল মারা চিঠিগুলো জরুরি ভিত্তিতে বড় কর্মকর্তার কাছে চলে যায় যাতে ক্ষুব্ধ নাগরিকের সমস্যা দ্রুত মেটানো যায়, আর সবুজ চিঠিগুলো আলাদা রাখা হয়।
কম্পিউটারের অনুভূতি বিশ্লেষণ ব্যবস্থা ঠিক এই ডাকঘরের সহকারীর মতোই ক্ষিপ্র। সে বাক্যের প্রতিটি শব্দের আবেগের ওজন মাপে। ইতিবাচক শব্দ থাকলে যোগ পয়েন্ট যোগ হয়, আর রাগের শব্দ থাকলে বিয়োগ পয়েন্ট বসে। সমস্ত হিসাব মিলিয়ে সে পুরো লেখাটির মেজাজ নির্ধারণ করে।
বাস্তব জগতে অনুভূতি বিশ্লেষণ আজ কোথায় কোথায় প্রয়োগ হচ্ছে?
আমাদের অলক্ষ্যেই আমাদের প্রতিটি অনলাইন মন্তব্যের এই আবেগীয় ওজন প্রতিনিয়ত মাপা হচ্ছে:
- গ্রাহক সেবা ও অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার: প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ গ্রাহকের বার্তা সিস্টেম চিনে ফেলে তাকে সবার আগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে সরাসরি কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়।
- পণ্য বা হোটেলের রিভিউ বিশ্লেষণ: কোনো মোবাইল বা হোটেলের ব্যাপারে হাজার হাজার মানুষের মতামত সংক্ষেপ করে 'ক্যামেরা দারুণ হলেও ব্যাটারি দুর্বল' এমন সারাংশ বের করা হয়।
- প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা: কোনো বড় ব্র্যান্ড বা সেবা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মানুষ ভালো বলছে নাকি সমালোচনা করছে তা সার্বক্ষণিক নজরে রাখা হয়।
- পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের মনোভাব যাচাই: বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর শেয়ার বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনোভাব আশাবাদী নাকি শঙ্কিত তা খবর বিশ্লেষণ করে দেখা হয়।
অনুভূতি মাপার কিছু স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা ও সজাগ সচেতনতা
কম্পিউটার শব্দ গুনতে পারলেও মানুষের মনের গভীর অনুভূতি বা রসিকতা ধরতে গিয়ে সে প্রায়ই বোকা বনে যায়।
- ব্যঙ্গ ও শ্লেষ বুঝতে কম্পিউটার প্রায়ই ভুল করে: আপনি যদি উপহাস করে লেখেন, 'বাহ! কী চমৎকার রাস্তা বানিয়েছেন, প্রথম দিনের বৃষ্টিতেই নদী হয়ে গেছে!', কম্পিউটার 'চমৎকার' শব্দ দেখে ভাববে আপনি প্রশংসা করেছেন।
- আঞ্চলিক প্রবাদ ও কথ্য ভাষার ভিন্নতা: খাঁটি গ্রাম্য বাংলা বা আঞ্চলিক কৌতুকের অন্তর্নিহিত অর্থ বের করা কম্পিউটারের গাণিতિક বুদ্ধির পক্ষে বেশ কঠিন।
- আমাদের প্রতিটি মন্তব্যই কিন্তু ডাটা হিসেবে জমা হচ্ছে: ইন্টারনেটে আমরা রাগারাগি করে যা কিছু লিখি, তার সবই প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারে অনুভূতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়—এই সচেতনতা রাখা জরুরি।
মানুষের হৃদয় হলো সমুদ্রের মতো গভীর ও রহস্যময়। কম্পিউটার কেবল উপরিভাগের ঢেউগুলোর হিসাব গুনতে পারে, কিন্তু অন্তরের খাঁটি আনন্দ কিংবা নিঃশব্দ বেদনার আসল মর্ম কেবল একজন মানুষই উপলব্ধি করতে সক্ষম। প্রযুক্তি হলো মানুষকে জানার এক প্রাথমিক মাধ্যম মাত্র।
উৎস
- Natural Language API basicsGoogle Cloud